স্ট্রেস হচ্ছে আধুনিক যুগের স্থায়ী এক মহামারি। এর থেকে পেপ্টিক আলসার, হার্টের অসুখ, ডিপ্রেশন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, গ্যাস্ট্রিক, হাইপার টেনশন, ডায়াবিটিস এমনকি কিছু বিশেষ ক্যান্সারও হয়। মানুষ যখন স্ট্রেসে ভোগা শুরু করে তখন প্রথমে অস্থিরতা, অল্পতে রেগে যাওয়া, বাড়িতে-স্কুলে-অফিসে মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করা শুরু হয়। তারপর মাথা ব্যাথা, হজমে সমস্যা, রাতে ঠিকমত ঘুমাতে না পারা, মোটা হয়ে যাওয়া শুরু হয়। বছরের পর বছর ক্রমাগত স্ট্রেস চলতে থাকলে একসময় জটিল সব অসুখ শুরু হয়।
মানুষ যখন স্ট্রেসে থাকে, তখন তার শরীরে এড্রেনালিন হরমোন মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে বের হতে থাকে। এই হরমোনটা মানুষকে দেওয়া হয়েছে বিপদের সময় যেন মানুষ অতিরিক্ত শারীরিক ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে। এই হরমোন বের হলে মানুষের রক্ত চাপ বেড়ে যায়। হৃদপিণ্ড স্বাভাবিকের থেকে বেশি জোরে চলতে থাকে। রক্তে গ্লুকোজ, চর্বি বেশি জমা হয়। এগুলো সবই দরকার বিপদের মুহূর্তে হঠাৎ করে বেশি শক্তির পাওয়ার জন্য, যাতে করে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়। কিন্তু এই হরমোন মানুষের রক্তে বেশিক্ষণ থাকলে তা অঙ্গগুলোকে নষ্ট করে দিতে থাকে। এড্রেনালিন হরমোন অল্প সময়ের জন্য শরীর সহ্য করতে পারে। কিন্তু স্ট্রেসে ভোগা মানুষের শরীরে প্রায় সবসময়ই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে এড্রেনালিন থাকে, যার কারণে তার ভেতরের জরুরি অঙ্গগুলো দ্রুত নষ্ট হতে থাকে।
যখন মানুষ স্ট্রেসে ভোগে, তখন তার বেশ কিছু রক্তনালি সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। যার ফলে অনেক অঙ্গে রক্ত চলাচল কমে যায়। এখন বিপদের সময় সেই সব অঙ্গে রক্ত কম গেলে সমস্যা নেই। কিন্তু সবসময় যখন সেই জরুরি অঙ্গগুলো রক্ত কম পেতে থাকে, তখন সেগুলো দ্রুত নষ্ট হতে থাকে।
স্ট্রেসে থাকলে মানুষের মস্তিষ্কে কর্টিসল নামে একটি কেমিক্যাল বের হয়, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার ফলে স্ট্রেসে ভোগা মানুষ অল্পতেই অসুখে ভোগেন। স্বাভাবিকের থেকে কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকার কারণে অল্পতেই ইনফেকশনের ফলে তার নানা ধরনের ইনফেকশন জনিত অসুখ হয়। আর কোনো ধরনের ঘা হলে, তা শুকাতে বেশি সময় লাগে।
স্ট্রেসে ভুগলে মানুষের শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ইনসুলিন বের হয়। যার ফলে রক্তে অতিরিক্ত ইনসুলিন জমা হতে থাকে। যার থেকে হার্টের অসুখ হয়। দিনরাত ইনসুলিন বেশি পরিমাণে বের হলে দ্রুত ডায়াবিটিস হয়। আর হলেও সেটা হয় ভয়াবহ আকারে।
স্ট্রেস হওয়ার কারণগুলো অনলাইনে বিভিন্ন সাইড থেকে দেখে নিতে পারেন। স্ট্রেসে ভুগতে হয় এমন কয়েকটি মূল কারণ : যেমন
— অজানাকে, অনিশ্চয়তাকে ভয় পাওয়া, এবং নিজের ভবিষ্যৎকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সবসময় চেষ্টা করা।
— অমূলক ভয়ভীতি এবং নেতিবাচক চিন্তায় আসক্ত থাকা।
— প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট, অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া।
— সত্যকে মেনে নিতে না পারার জন্য নিজের ভেতরে দ্বন্দ্ব তৈরি করা।
— সত্যকে মেনে নেয়ার জন্য নিজের ভেতরে যে পরিবর্তন আনতে হবে, যে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, সেটা করতে না পারার কারণে নিজের সাথে যুদ্ধ করা।
এগুলোর সমাধান খুব সহজ। অজানা, অনিশ্চয়তাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, সেটা হবেই। আপনি আপনার সাধ্যমত চেষ্টা করুন। ফলাফল সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। এরকম কখনই হবে না যে, আল্লাহ চেয়েছিলেন একটা, কিন্তু আপনি এমন কঠিন পরিশ্রম করলেন যে, আপনার চেষ্টার চোটে আপনি যা চাচ্ছিলেন সেটাই হলো। আপনি আল্লাহর উপর জিতে গেলেন। এরকম কখনই হবে না। তাহলে দিনরাত খাওয়া, ঘুম নষ্ট করে, নামাজ না পড়ে; পরিবার, প্রতিবেশী এবং আত্মীয় সম্পর্ক খারাপ করে, নিজের জীবনটাকে শেষ করে কী লাভ?
وَأَنَّهُ هُوَ أَضْحَكَ وَأَبْكَى
'তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষকে হাসান এবং কাঁদান। তিনিই তো মৃত্যু দেন, জীবন দেন'। [আন-নাজম ৫৩:৪৩]
অর্থাৎ কারও আনন্দ অথবা শোক এবং হাসি ও কান্না স্বয়ং তার কিংবা অন্য কারও করায়ত্ত নয়। এগুলো আল্লাহ তা’আলার পক্ষে থেকে আসে। তিনিই কারণ সৃষ্টি করেন এবং তিনিই কারণাদিকে ক্রিয়াশক্তি দান করেন। [ইবন কাসীর; কুরতুবী]
أَوَلاَ يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لاَ يَتُوبُونَ وَلاَ هُمْ يَذَّكَّرُونَ
তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতি বছর তারা দু'একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে, অথচ, তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না। [ সুরা তাওবা ৯:১২৬ ]
সমাপ্ত
লেখাঃ ডা. সাঈদ (আল্লাহ্ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!)
আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক ইন শা আল্লাহ ’ লেখাটি শেয়ার করুন বন্ধুদের সাথে!
0 Comments